কোরবানির (মাংস, গোশত, গোস্ত) বণ্টনের নিয়ম | কুরবানীর (গোস্ত, মাংস) বণ্টনের নিয়ম

কোরবানি দেয়ার পর কোরবানির মাংস বা গোশত বন্টন করা একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। কোরবানির মাংস সঠিকভাবে বন্টন করা না যায় তবে কোরবানি কবুলের শর্ত পূরণ হবে না। তাই কুরবানীর গোশত বন্টনের ক্ষেত্রে সতর্ক হতে হবে।

কমবেশি সবারই জানা আছে, পশু কোরবানি করার পর মোট মাংসের তিনটি ভাগ করে এক ভাগ গরিব-দুঃখীকে, এক ভাগ আত্মীয়স্বজনকে এবং এক ভাগ নিজে খাওয়ার জন্য রাখতে হয়। তাই পশুটি কেনার সময় সুস্থ এবং বেশি মাংস সম্পন্ন হলে সব পক্ষই লাভবান হয়।

কোরবানির মাংস বন্টনের নিয়ম, কোরবানির গোশত বন্টনের নিয়ম- কোরবানির গোস্ত বন্টনের নিয়ম | kurbanir gosto bontonকোরবানির (মাংস, গোশত, গোস্ত) বণ্টনের নিয়ম | কুরবানীর (গোস্ত, মাংস) বণ্টনের নিয়ম 

জাহেলী আরবরা কা'বার উদ্দেশ্যে উৎসর্গীত পশুর গোশত নিজেরা খেত না। বরং সবটুকু ছাদাক্বা করে দিত। ইসলাম আসার পরে আল্লাহর উদ্দেশ্যে যবহকৃত কুরবানীর পশুর গোশত নিজেরা খাওয়ার ও অন্যকে খাওয়ানোর নির্দেশ দিয়ে বলা হয়, অতঃপর তোমরা তা থেকে নিজেরা খাও এবং অন্যদের খাওয়াও যারা চায় না ও যারা চায়’ (হজ্জ ২২/৩৬)। অন্য আয়াতে এসেছে, ‘অতঃপর তোমরা খাও এবং দুস্থ ও অভাবীদের খাওয়াও' (হজ্জ ২২/২৮)।

কুরবানীর গোস্ত বন্টনের হাদিস

ইবনু আব্বাস (রাঃ) বলেন, আল্লাহর রাসূল (ছাঃ) কুরবানীর গোশত তিনভাগ করে একভাগ নিজ পরিবারকে খাওয়াতেন ও একভাগ অভাবী প্রতিবেশীদের দিতেন ও একভাগ সায়েলদের মধ্যে ছাদাক্বা করতেন’ । অতএব কুরবানীর গোশত তিন ভাগ করে এক ভাগ নিজ পরিবারের জন্য, এক ভাগ অভাবী প্রতিবেশী যারা কুরবানী করতে পারেনি তাদের জন্য হাদিয়া স্বরূপ ও একভাগ সায়েল ফক্বীর-মিসকীনদের মধ্যে ছাদাক্বা স্বরূপ বিতরণ করবে (নায়েল ৬/২৫৪ পৃ.)। 

প্রয়োজনে উক্ত বন্টনে কমবেশী করায় কিংবা সবটুকু বিতরণ করায় কোন দোষ নেই। বণ্টন বিষয়ে উত্তম হ'ল, মহল্লার স্ব স্ব কুরবানীর গোশতের এক তৃতীয়াংশ এক স্থানে জমা করে মহল্লায় যারা কুরবানী করতে পারেনি, তাদের তালিকা করে তাদের মধ্যে সুশৃংখলভাবে বিতরণ করা এবং প্রয়োজনে তাদের বাড়ীতে কুরবানীর গোশত পৌছে দেওয়া। বাকী এক তৃতীয়াংশ ফকীর- মিসকীনদের মধ্যে বিতরণ করা। এর ফলে কুরবানী দাতা রিয়া ও শ্রুতি থেকে নিরাপদ থাকবেন এবং অন্তর পরিশুদ্ধ হবে। আর এটাই হ'ল কুরবানীর মূল প্রেরণা।

অনেকের মধ্যে দেখা যায়, তারা তাদের আত্মীয়-স্বজনের মধ্যে কুরবানীর গোশত বিতরণ করেন। যদিও তারা নিজেরা কুরবানী করেছেন। এটা ঠিক নয়। কেননা এর ফলে অভাবী প্রতিবেশী যারা কুরবানী করেনি এবং সায়েল ও মিসকীনদের অংশ কমে যায়। অনেকে গোশত জমা করে সেখান থেকে প্রতিবেশী ও ফকীর-মিসকীনদের কিছু কিছু দিয়ে বাকী গোশত পুনরায় বণ্টনকারীরা নিজেদের মধ্যে বণ্টন করে নেন। এটি একটি কুপ্রথা। এতে কৃপণতা প্রকাশ পায়। যা অবশ্যই বর্জনীয়। আল্লাহ বলেন, 'যারা তাদের হৃদয়ের কার্পণ্য থেকে মুক্ত, তারাই সফলকাম' (হাশর ৫৯/৯; তাগাবুন ৬৪/১৬)।

কোরবানির মাংস বন্টনের নিয়ম, কোরবানির গোশত বন্টনের নিয়ম- কোরবানির গোস্ত বন্টনের নিয়ম | কুরবানীর গোস্ত বন্টনের নিয়ম কুরবানির মাংস বন্টনের নিয়ম

তিনভাগে কিভাবে বন্টন করবেন কোরবানির মাংস বা গোশত। তা জেনে নিই। কোরবানির মাংস বানানোর পর। সব কুরবানীর গোশত বা মাংসকে সমান তিনভাগে ভাগ করতে হবে। পরিমাপের ক্ষেত্রে দাড়িপাল্লা ব্যবহার করা যেতে পারে। কোরবানির গোশত বা মাংস সমান তিন ভাগ করার পর। 

  • এক ভাগ গরিব-দুঃখীকে
  • এক ভাগ আত্মীয়স্বজনকে
  • এক ভাগ নিজে খাওয়ার জন্য রাখতে হয়।

কোরবানির পশুর চামড়া 

কোরবানির গরুর আরেকটি অংশ হচ্ছে চামড়ার টাকা। যাতে গরীর মিসকিনদের হক রয়েছে। কোরবানির মাংস সব সময় নিকটতম আত্নীয় ও আশপাশের গরিব-দূঃখী প্রতিবেশিদের দেয়া উত্তম।

কোরবানির মাংস বন্টনের জরুরী বিষয় বা মাসায়েল

কোরবানি সহিহ করতে মাংস বন্টন ও বেশ কিছু নিয়ম জানা জরুরী। বিষয়গুলো হাদিস শরীফের আলোকে তুলে ধারা হয়েছে-

১. শরীকে বা যৌথভাবে অথবা ভাগে কুরবানি করলে ওজন বা মেপে গোশত বণ্টন করতে হবে। অনুমান করে ভাগ করা জায়েয নয়।

২. কোরবানি গোশতের এক তৃতীয়াংশ গরীব-মিসকীনকে এবং এক তৃতীয়াংশ আত্মীয়-স্বজন ও পাড়া-প্রতিবেশীকে দেওয়া উত্তম। অবশ্য পুরো গোশত যদি নিজে রেখে দেয় তাতেও কোনো অসুবিধা নেই।

৩. কুরবানীর গোশত, হাড্ডি, চর্বি ইত্যাদি বিক্রি করা জায়েয নাই। বিক্রি করলে পূর্ণ মূল্য সদকা করে দিতে হবে।

৪. কোরবানির গোশত হিন্দু ও অন্য ধর্মাবলম্বীকে দেওয়া জায়েয।

৫. জবাইকারী, কসাই বা কাজে সহযোগিতাকারীকে চামড়া, গোশত বা কোরবানির পশুর কোনো কিছু পারিশ্রমিক হিসেবে দেওয়া জায়েয হবে না। অবশ্য পূর্ণ পারিশ্রমিক দেওয়ার পর পূর্বচুক্তি ছাড়া হাদিয়া হিসাবে গোশত বা তরকারী দেওয়া যাবে।

৬. কুরবানীর চামড়া কুরবানীদাতা নিজে ব্যবহার করতে পারবে। তবে কেউ যদি নিজে ব্যবহার না করে বিক্রি করে দেয়। তাহলে বিক্রিলব্ধ মূল্য পুরো টাকা সদকা করা আবশ্যক।

৭. কোরবানির পশুর চামড়া বিক্রি করলে মূল্য সদকা করে দেওয়ার নিয়তে বিক্রি করবে। সদকার নিয়ত না করে নিজের খরচের নিয়ত করা নাজায়েয ও গুনাহ। নিয়ত যা-ই হোক বিক্রিলব্ধ অর্থ পুরোটাই সদকা করে দেওয়া জরুরি।

৮. এক কোরবানির পশুতে আকীকা, হজ্বের কুরবানীর নিয়ত করা যাবে। এতে প্রত্যেকের নিয়তকৃত ইবাদত আদায় হয়ে যাবে।

৯. ঈদুল আযহার দিন সর্বপ্রথম নিজ কোরবানির গোশত দিয়ে খানা শুরু করা সুন্নত। অর্থাৎ সকাল থেকে কিছু না খেয়ে প্রথমে কোরবানির গোশত খাওয়া সুন্নত। এই সুন্নত শুধু ১০ যিলহজ্বের জন্য।

১০. কোরবানির মৌসুমে অনেক মহাজন কোরবানির হাড় ক্রয় করে থাকে। টোকাইরা বাড়ি বাড়ি থেকে হাড় সংগ্রহ করে তাদের কাছে বিক্রি করে। এদের ক্রয়-বিক্রয় জায়েয। এতে কোনো অসুবিধা নেই। কিন্তু কোনো কোরবানিদাতার জন্য নিজ কুরবানীর কোনো কিছু এমনকি হাড়ও বিক্রি করা জায়েয হবে না। করলে মূল্য সদকা করে দিতে হবে। আর জেনে শুনে মহাজনদের জন্য এদের কাছ থেকে ক্রয় করাও বৈধ হবে না।

১১. কোরবানির পশুর কোনো কিছু পারিশ্রমিক হিসাবে দেওয়া জায়েয নয়। গোশতও পারিশ্রমিক হিসেবে কাজের লোককে দেওয়া যাবে না। অবশ্য এ সময় ঘরের অন্যান্য সদস্যদের মতো কাজের লোকদেরকেও গোশত খাওয়ানো যাবে।

১২. কোরবানির পশু জবাই করে পারিশ্রমিক দেওয়া-নেওয়া জায়েয। তবে কোরবানির পশুর কোনো কিছু পারিশ্রমিক হিসাবে দেওয়া যাবে না।

১৩. কোনো কোনো এলাকায় দরিদ্রদের মাঝে মোরগ কোরবানির করার প্রচলন আছে। এটি না জায়েয। কুরবানীর দিনে মোরগ জবাই করা নিষেধ নয়, তবে কুরবানীর নিয়তে করা যাবে না।

১৪. কোরবানির পশুর চামড়ার মালিক কুরবানীদাতা। সে ইচ্ছা করলে তা ব্যবহারও করতে পারে। সে যদি চামড়াটি দান করে দিতে চায় তবে বিক্রি না করে আস্ত দান করাই উত্তম। বিক্রি করলে এর মূল্যের হকদার হয়ে যায় ফকীর-মিসকীন তথা যাকাত গ্রহণের উপযুক্ত লোকজন। আর এদের মধ্যে আত্মীয়-স্বজনও দ্বীনদারগণ অগ্রাধিকারযোগ্য।

কোরবানির মাংস বা গোশত সংরক্ষণ করা যাবে?, কুরবানীর মাংস কতদিন খাওয়া যায় 

কুরবানীর গোশত যতদিন খুশী রেখে খাওয়া যায়। হযরত সালামা বিন আকওয়া' (রাঃ) বলেন, রাসূল (ছাঃ) আমাদেরকে তিন দিনের ঊর্ধ্বে কুরবানীর গোশত ঘরে রাখতে নিষেধ করেন। কিন্তু পরের বছর তিনি বলেন, ‘তোমরা কুরবানীর গোশত খাও, অন্যকে খাওয়াও এবং সঞ্চিত রাখ। কেননা গত বছর মানুষের কষ্ট ছিল। সেকারণ আমি চেয়েছিলাম তোমরা গোশত সঞ্চয় না করে তা দিয়ে লোকদের সাহায্য কর’ । এমনকি তিনি ‘এক যুলহিজ্জাহ থেকে আরেক যুলহিজ্জাহ পর্যন্ত সঞ্চিত রাখার অনুমতি দেন। অতএব মহল্লায় অভাবীর সংখ্যা বেশী থাকলে বা দেশে ব্যাপক অভাব দেখা দিলে তিনদিনের পর গোশত সবটুকু বিতরণ করা যরূরী (মুসলিম হা/১৯৭২)।

কোরবানির মাংস অমুসলিমকে কি দেওয়া যাবে 

আল্লাহ্ নামে উৎসর্গীত কুরবানীর পবিত্র গোশত মুসলিমদের মধ্যেই বিতরণ করা উত্তম। তবে অমুসলিম প্রতিবেশীদের কিছু দেওয়ায় দোষ নেই। কেননা এটি যাকাত বহির্ভূত নফল ছাদাক্বার অন্তর্ভুক্ত। হযরত আব্দুল্লাহ বিন আমর ইবনুল ‘আছ (রাঃ) স্বীয় গোলামকে বলেন, ‘তুমি আমাদের ইহূদী প্রতিবেশীকে দিয়েই গোশত বণ্টন শুরু কর’ । ‘তোমরা মুসলমানদের কুরবানী থেকে মুশরিকদের আহার করাইয়ো না’ মর্মে যে হাদীছ এসেছে সেটি ‘যঈফ’।

Tag: কোরবানির মাংস বন্টনের নিয়ম, কোরবানির গোশত বন্টনের নিয়ম, কোরবানির গোস্ত বন্টনের নিয়ম, কুরবানীর গোস্ত বন্টনের নিয়ম, কুরবানির মাংস বন্টনের নিয়ম, কোরবানির (মাংস, গোশত, গোস্ত) বণ্টনের নিয়ম, কুরবানীর (গোস্ত, মাংস) বণ্টনের নিয়ম, কোরবানির মাংস বন্টনের সঠিক নিয়ম, কোরবানির মাংস বন্টন নিয়ম পদ্ধতি, কোরবানির মাংস বন্টনের নিয়ম মিজানুর রহমান, kurbanir gosto bonton

Next Post Previous Post