মহাকবি আল্লামা ইকবাল (রহ:) এর জীবনী | আল্লামা ইকবালের জীবনী | আল্লামা ইকবাল | Allama Ikbal Jiboni Bangla

মহাকবি আল্লামা ইকবাল (রহ:) এর জীবনী | আল্লামা ইকবালের জীবনী | আল্লামা ইকবাল | Allama Ikbal Jiboni Bangla

মহাকবি আল্লামা ইকবাল (রহ:) এর জীবনী | আল্লামা ইকবালের জীবনী | আল্লামা ইকবাল | Allama Ikbal Jiboni Bangla

মহাকবি আল্লামা ইকবাল (রহ:) এর জীবনী | আল্লামা ইকবালের জীবনী | আল্লামা ইকবাল | Allama Ikbal Jiboni Bangla


‘আরব হামারা চীন হামারা হিন্দুস্তা হামারা,
মুসলিম হ্যায় হাম, এতন হ্যায় সারা জঁহা হামারা।

কোন কোন মানুষকে আল্লাহ বিশেষভাব সৃষ্টি করেন দেশ ও জাতির খেদমতের জন্য। শত ঝড়ঝঞা বাধা বিপত্তি উপেক্ষা করে সেসব মানুষ তাদের কাজ বাস্তবায়িত করার চেষ্টা করে যান। আমরা আজকে এমন এক মহান ব্যক্তিত্ব ও কবি পুরুষ আল্লামা ইকবাল সম্বন্ধে আলােচনা করব।

তােমরা হয়ত কোন না কোনভাবে শুনে থাকবে মহাকবি আল্লামা ইকবাল সম্পর্কে। হয়ত কথাটা এজন্য বললাম যে, বর্তমানে আমাদের দেশে কবি। ইকবালকে জানার তেমন কোন সুযােগ নেই। সত্যি কথা বলতে কি এই মহান কবিকে ইচ্ছে করেই এড়িয়ে চলার চেষ্টা করা হচ্ছে।


কবি ইকবাল পাকিস্তানের পাঞ্জাব প্রদেশের শিয়ালকোট নামক স্থানে ১৮৭৭। সালের ৯ নভেম্বর এক সম্ভ্রান্ত মুসলিম পরিঝরে জন্মগ্রহণ করেন। তার পিতার নাম।শেখ নূর মােহাম্মদ এবং মাতার নাম ইমাম বীবী। কবির পিতা-মাতা উভয়েই।অত্যন্ত দ্বীনদার ও পরহিজগার মানুষ ছিলেন। কবির পূর্ব পুরুষগণ কাশ্মীরবাসী সাপ গােত্রীয় ব্রাহ্মণ পণ্ডিত ছিলেন। তারা সুলতান জয়নুল আবেদীন ওরফে বুদ শাহ (১৪২১-১৪৭৩ খৃঃ)-এর রাজত্বকালে ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করেন। তাঁর দাদা শিয়ালকোটে এসে স্থায়ীভাবে বসবাস শুরু করেন এবং ষাট বছর বয়সে ইন্তেকাল।করেন।


কবির পিতা শেখ নূর মােহাম্মদ উচ্চ শিক্ষিত কোন মানুষ ছিলেন না কিন্তু তিনি।একজন স্বনামধন্য পণ্ডিত ছিলেন। যার কারণে শামসুল উলামা সৈয়দ মীর হাসান তাঁকে (কবির পিতাকে) অশিক্ষিত দার্শনিক উপাধিতে ভূষিত করেছিলেন।


ইকবালের জন্মের ব্যাপারে কথিত আছে যে, একদিন তার পিতা স্বপ্নে দেখলেন, আকাশচারী একটি অসম্ভব সুন্দর কবুতর তার কোলে এসে পড়ল। পরে।তিনি স্বপ্ন বিশারদের নিকট থেকে জানতে পারলেন অদূর ভবিষ্যতে তিনি একজন ভাগ্যবান পুত্রের বাপ হতে যাচ্ছেন। আরও কথিত আছে শেখ নূর মােহাম্মদের কোলে যখন সদ্য ভূমিষ্ট ইকবালকে দেয়া হয় তখন তিনি সদ্যজাত শিশু পুত্রকে লক্ষ্য করে বলেছিলেন, বড় হয়ে দ্বীনের খেতমত করলে বেঁচে থাক, না হলে এখনই মরে যাও।' বুঝতে পারছ তার স্নেহময় পিতা তার কাছ থেকে ইসলাম ও মুসলমানদের খেদমতের জন্য কি আশা করেছিলেন ?


পিতা নূর মােহাম্মদ-এর ইচ্ছে ছিল পুত্রকে মাদ্রাসায় পড়ানোের কিন্তু ওস্তাদ শামসুল উলামা মীর হাসানের পরামর্শে তাঁকে ইংরেজি স্কুলে ভর্তি করা হয়। প্রাইমারী শিক্ষা শেষ হলে তাঁকে শিয়ালকোট স্কচ মিশন স্কুলে ভর্তি করা হয়। এ স্কুল থেকে তিনি ১৮৯৩ সালে ম্যট্রিকুলেশন পাস করেন। স্কচ স্কুলের ছাত্র থাকাকালে তিনি একদিন দেরিতে ক্লাসে আসেন, ক্লাস টিচার তাঁর দেরিতে ক্লাসে।আসার কারণ জিজ্ঞেস করলে বালক ইকবাল তৎক্ষণাত উত্তর দেন, ইকবাল (সৌভাগ্য) দেরিতে আসে স্যার।' উত্তর শুনে পণ্ডিত শিক্ষক তাে থ’ । তিনি যে শুধু উপস্থিত বুদ্ধিতে দক্ষ ছিলেন তা নয়। ছাত্র হিসেবে তিনি ছিলেন প্রচণ্ড মেধাবী। জানা যায় ১৮৮৮ সালে প্রাথমিক বৃত্তি পরীক্ষায়, ১৮৯১ সালে নিম্নমাধ্যমিক বৃত্তি পরীক্ষায় ও ১৮৯৩ সালে প্রবেশিকা পরীক্ষায় প্রথম স্থান অধিকার করে স্বর্ণপদক ও।মাসিক বৃত্তি লাভ করেন। ১৮৯৩ সালে স্কচ মিশন স্কুল কলেজে উন্নীত হলে ইকবাল ঐখানে এফ. এ শ্রেণীতে ভর্তি হন। ১৮৯৫ সালে অনুষ্ঠিত এফ. এ পরীক্ষাতেও তিনি প্রথম বিভাগে পাস করেন এবং যথারীতি বৃত্তিসহ স্বর্ণপদক লাভ করেন।


১৮৯৫ সালে তিনি শিয়ালকোট থেকে লাহাের চলে আসেন এবং লাহাের সরকারী কলেজে বি. এ ভর্তি হন। এখানে একটা খবর দিয়ে রাখি, ইকবাল যখন বি.এ পড়ার জন্য পিতার নিকট অনুমতি চাইলেন তখন তাঁর পিতা কি বলেছিলেন, ছাত্র জীবন শেষ করবার পর অবশিষ্ট জীবন ইসলামের খিদমতে ওয়াফ করে
দিতে হবে।


তিনি তাতেই রাজী হয়েছিলেন। আর সত্যি সত্যিই তার সারাটা জীবন ইসলামের জন্য উৎসর্গ করেছিলেন। লাহাের সরকারী কলেজে অধ্যয়নকালে তিনি টি, ডব্লিউ-এর মত ভূবন বিখ্যাত একজন সুযােগ্য শিক্ষক পান। যিনি ছিলেন আরবী।ভাষায় সুপণ্ডিত, দর্শনের অধ্যাপক ও প্রখ্যাত সাহিত্যিক। প্রতিভাবান ইকবালকে ছাত্র হিসেবে পেয়ে আরনল্ড সাহেব তাকে আপন করে নিয়েছিলেন এবং মনের মত করে গড়ে তুলেছিলেন। ১৮৯৭ সালে তিনি আরবী ও ইংরেজিতে সমগ্র পাঞ্জাবে প্রথম স্থান নিয়ে বি. এ পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হন। যে কারণে তিনি এবার দু'টি স্বর্ণপদক লাভ করেন। এরপর ১৮৯৯ সালে কৃতিত্বের সাথে দর্শন শাস্ত্রে এম. এ পাস করেন। সাথে সাথে তিনি লাহাের ওরিয়েন্টাল কলেজে ইতিহাস ও দর্শনশাস্ত্রের অধ্যাপক নিযুক্ত হন। এর সামান্য কিছুদিন পরেই তিনি লাহাের সরকারী কলেজ ও।ইসলামিয়া কলেজের ইংরেজি ও দর্শনশাস্ত্রের খণ্ডকালীন সহকারী অধ্যাপক নিযুক্ত হন। এ সময়ে উর্দু ভাষায় অর্থশাস্ত্র সম্বন্ধে তাঁর সর্বপ্রথম পুস্তক রচনা করেন। তাঁর জীবন ছিল ছকে বাঁধা। এ সম্বন্ধে ইসলামী বিশ্বেকোষ' লিখেছে, “তিনি ভােরে।উঠে ফজরের সালাত আদায় করতেন, অতঃপর উচ্চস্বরে কোরআন তিলাওয়াত।করতেন। তারপর কিছুক্ষণ শরীর চর্চা করতেন এবং কিছু না খেয়ে কলেজে যেতেন। দুপুরে বাড়ি ফিরে আহার করতেন। অনেক সময় গভীর রাতে উঠে।তাহাজ্জুদ সালাত আদায় করতেন। একবার তিনি একাধারে দুই মাস এই রাত্রিকালীন সালাত আদায় করেন।


১৯০৫ সালে তিনি উচ্চ শিক্ষা গ্রহণের মানসে লণ্ডন গমন করেন। পথিমধ্যে।তিনি খাজা নিযামুদ্দীন আউলিয়া, সূফী কবি আমীর খসরু ও মহাকবি গালিবের মাযার জিয়ারত করেন। কেম্ব্রিজ বিশ্ববিদ্যালয় হতে তিনি দর্শন শাস্ত্রে এম. এ ডিগ্রি লাভ করেন। এ সময় তিনি শিক্ষক হিসেবে পান বিশ্ব খ্যাত দার্শনিক ডঃ এম সি ট্যাগার্টকে। এরপর তিনি পশ্চিম ইউরােপ ভ্রমণে বের হন। শেষে জার্মানীর মিউনিখ বিশ্ববিদ্যালয় হতে পারস্যের দর্শন শাস্ত্র বিষয়ক সন্দর্ভ লিখে ১৯০৭ সালে পি. এইচ, ডি ডিগ্রি লাভ করেন। এরপরের বছর ১৯০৮ সালে Lincoln Inn হতে ব্যারিস্টারী পাস করেন। এ সময় তাঁর প্রিয় শিক্ষক স্যার আর্নল্ড লন্ডন বিশ্ববিদ্যালয়ের আরবীর অধ্যাপক ছিলেন। তিনি বিশেষ কারণে কয়েক মাসের ছুটিতে গেলে ইকবাল ৬ মাসের জন্য তার স্থানে আরবীর অস্থায়ী অধ্যাপক নিযুক্ত হন।


১৯০৮ সালের ২৭ জুলাই তিনি দেশে ফিরে এলে লাহােরের বিশিষ্ট ব্যক্তিগণ তাঁকে বিপুলভাবে সম্বর্ধিত করেন। তিনি লাহাের ফিরে পূর্বপদে বহাল হন এবং সরকারের অনুমতিক্রমে আইন ব্যবসা শুরু করেন। অবশ্য দেড় বছর পর চাকরি ছেড়ে দিয়ে স্থায়ীভাবে আইন ব্যবসায় মননানিবেশ করেন। তবে একটা কথা তােমাদের জেনে রাখা দরকার যে, তিনি কখনই মাসিক খরচের পরিমাণ টাকা রােজগারের পর কোনও মােকদ্দমা গ্রহণ করতেন না। আরও একটা কথা, তিনি যদি বুঝতেন কোন মােকদ্দমায় মক্কেলের তেমন উপকার করতে পারবেন না তাহলেও তিনি সে কেস গ্রহণ করতেন না। শেষ জীবন পর্যন্ত এভাবে তিনি তাঁর সিদ্ধান্তে অটল থাকেন।


ছাত্রাবস্থায় ১৮৯৬ সালে সিয়ালকোটের এক কবিতানুষ্ঠানে অংশগ্রহণের মধ্যদিয়ে তাঁর কবি প্রতিভার বিকাশ লাভ করতে শুরু করে। এরপর তিনি বেশ কিছু কবিতা লিখে হায়দারাবাদের প্রখ্যাত কবি দাগের নিকট পাঠিয়ে দেন সংশােধনের জন্য। কবি দাগ কিশাের কবির এ কবিতাগুলি পেয়ে মনােযােগ সহকারে পড়েন ও চমক্কার একটা মন্তব্য লিখে পাঠান। কবি দাগ লিখেছিলেন, ‘এ কবিতাগুলাে সংশােধন করার কোন দরকার নেই এগুলাে কবির স্বচ্ছ মনের সার্থক, সুন্দর ও অনবদ্য ভাব প্রকাশের পরিচয় দিচ্ছে। কবি ইকবাল এ চিঠি পেয়ে তাে আনন্দে লাফালাফি শুরু করে দিলেন। তারপর থেকে চললাে তাঁর বিরামহীন কাব্যসাধনা । এরপর ১৯০০ সালে তিনি লাহােরে অনুষ্ঠিত আঞ্জুমানে হিমায়েতে ইসলাম-এর বার্ষিক সাধারণ সভায় জীবনের প্রথম জনসমক্ষে তাঁর বিখ্যাত কবিতা নালা ইয়াতীম' বা অনাথের আর্তনাদ পাঠ করেন। কবিতাটি পড়ার পর চারিদিকে ধন্য ধন্য পড়ে যায়। মানে কবিতাটি এত জনপ্রিয়তা অর্জন করে যে, তাৎক্ষণিকভাবে কবিতাটি ছাপানাে হয় এবং এর প্রতিটি কপি সে সময়ে চার টাকা দামে বিক্রি হয়। বিক্রয়লব্ধ প্রচুর পরিমাণ টাকা ইয়াতিমদের সাহায্যার্থে চাঁদা হিসেবে গৃহীত হয়। ১৯০১ সালে তিনি ছােটদের জন্য লেখেন, মাকড়সা ও মাছি, পর্বত ও কাঠ বিড়ালি, শিশুর প্রার্থনা, সহানুভূতি, পাখীর নালিশ, মায়ের স্বপ্ন প্রভৃতি কবিতা।


এরপর তিনি দু'হাতে অসংখ্য কবিতা লিখেছেন। তাঁর কবিতার বিষয়বস্তু ছিল, ‘স্বদেশ প্রেম, মুসলিম উম্মাহর প্রতি মমত্ববােধ, ইসলামের শাশ্বত আদর্শে তাওহীদভিত্তিক বিশ্বরাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার স্বপ্ন, জাতির উত্থান-পতন, দলীয় কলহ ও অন্তর্দ্বন্দ্ব। নিরসন প্রভৃতি বিষয় কবিতায় স্থান পেতাে। ঘুমন্ত মুসলিম জাতিকে তিনি বেলালী  সুরে আহ্বান জানাতেন ক্লান্তিহীনভাবে। স্বকীয় আদর্শের সন্ধানে যুব সমাজকে উদ্বুদ্ধ করে তোলাই তার লক্ষ্য ছিল।

তাঁর কাব্যে এ ধরনের চিরন্তন বেদন থাকার কারণে তিনি অল্প সময়ের।মধ্যেই সারা বিশ্বে খ্যাতি লাভ করতে সক্ষম হন। নানামুখি প্রতিভার অধিকারী এ মহান ব্যক্তিত্ব তাই জাতি ধর্ম নির্বিশেষে সর্বমহল থেকে অকুণ্ঠ সম্মান অর্জন করেন। এ প্রসংগে তােমাদের অবগতির জন্য মহীশুর বিশ্ববিদ্যালয়ের দর্শন বিভাগের একজন হিন্দু অধ্যাপকের মত তুলে ধরছি। তিনি বলেছিলেন, মুসলমানগণ ইকবালকে লক্ষ্যবার তাদের সম্পদ বলে দাবি করতে পারেন। কিন্তু তিনি কোন ধর্ম বা শ্ৰেণীবিশেষের সম্পদ নন-তিনি একন্তভাবে আমাদেরও। ১৯০১ সালে ‘ হিমালাহ' নামক কবিতাটি তৎকালীন সময়ের উর্দু ভাষার সর্বশ্রেষ্ঠ পত্রিকা মাখানে’ ছাপা হয়। এটিই পত্রিকায় প্রকাশিত কবির প্রথম কবিতা। মুসলমানদের জন্য স্বতন্ত্র শিক্ষা ব্যবস্থা প্রবর্তনের দাবিতে তিনি এ সময় অনেকগুলাে পাঠ্যপুস্তক রচনা করেন। ১৯০৩ সালে লাহাের থেকে অর্থনীতির ওপর তার প্রথম পুস্তক ‘আল-ইলমুল ইকতেসাদ’ প্রকাশিত হয়।


১৯২৪ সালে বাজেদারা’ বা ঘন্টাধ্বনি নামক তাঁর বিখ্যাত কবিতার সংকলন প্রকাশিত হয়। এ পর্যন্ত এ গ্রন্থটির বহু সংস্করণ প্রকাশিত হয়েছে। ১৯১৫ সালে প্রকাশিত হয় তাঁর প্রথম কাব্যগ্রন্থ 'আসরার-ই-খুদী' বা ব্যক্তিত্বের গূঢ় রহস্য। এ কাব্য গ্রন্থটি ১৯২০ সালে ইংরেজি ভাষায় অনূদিত হয়ে প্রকাশিত হয়। অনুবাদ করেন ডঃ আর. এ নিকোলসন। সাথে সাথে সমগ্র পশ্চিমা বিশ্বে মহাকবি ও বিশ্বকবি আল্লামা ইকবালের খ্যাতি ছড়িয়ে পড়ে। ১৯৪৫ সালে ‘আসরার-ই-খুদী' বাংলা ভাষায় অনূদিত হয়ে প্রকাশিত হয়। গ্রন্থটি বিশ্বের বহুভাষায় অনূদিত হয়েছে ও প্রকাশিত হয়েছে।


১৯১১ ও ১৯১২ সালে জনসমক্ষে পঠিত তাঁর বিশ্ববিখ্যাত কবিতা ‘শিকওয়াহ’ বা অভিযােগ ও জওয়াব-ই-শিকওয়াহ’ বা অভিযােগের জবাব উর্দু ভাষায় রচিত। এ দীর্ঘ দু'টি কবিতার কাব্যগ্রন্থ দু'টির বাংলা ভাষায় একাধিক অনুবাদ প্রকাশিত হয়েছে। ১৯১২ সালে প্রকাশিত হয় ফারসী ভাষায় রচিত পায়াম-ই-মাশরিক প্রাচ্যের বাণী কাব্যগ্রন্থটি। গ্রন্থটি আরবী, ইংরেজি, তুর্কী, জার্মান ও রুশ ভাষায় অনূদিত হয়। ১৯১৮ সালে প্রকাশিত হয় ফারসী ভাষায় রামূষ-ই-বেখুদী' ব আত্মবিলােপের গুঢ়তত্ত্ব কাব্যগ্রন্থটি। মূলত এ গ্রন্থটি আসরে খুদী'র দ্বিতীয়াংশ। শুনলে আশ্চর্য হতে হয় যে ১৯৬৪ সাল পর্যন্ত এই গ্রন্থটির ৮৪তম সংস্করণ প্রকাশিত হয়েছে। তার বালে জিবরীল বা জিবরাঈলের ডানা ১৯৩৫ সালে প্রকাশিত হয়। এটি উর্দু ভাষায় রচিত। দরবারে কালীম' বা মূসার লাঠির আঘাত কাব্যগ্রন্থটি প্রকাশিত হয় ১৯৩৬ সালে। উর্দু ভাষায় রচিত এ কাব্যগ্রন্থটি আরবী ও রুশ ভাষায় অনূদিত হয়েও প্রকাশিত হয়।


এর আগে ১৯২৭ সালে প্রকাশিত হয় তাঁর যাবুরে আজম বা প্রাচ্যের ধর্ম সংগীত কাব্যগ্রন্থটি। ১৯৩২ সালে প্রকাশিত হয় ফারসী ভাষায় রচিত ‘জাবীদ নামা’ বা অমর লিপি কাব্যগ্রন্থটি। এমনিভাবে একের পর এক তাঁর কাব্যগ্রন্থ প্রকাশিত হতে থাকে। তাঁর রচিত কাব্যগ্রন্থগুলি বিশ্বের বিজ্ঞি ভাষায় অনূদিত হয়ে অসংখ্য সংস্করণ প্রকাশিত হয়েছে। সম্ভবত তিনি প্রাচ্যের সেই ভাগ্যবান কবি ব্যক্তিত্ব যার রচনা এত ব্যাপকভাবে পৃথিবীর বিভিন্ন ভাষায় অনূদিত ও প্রকাশিত হয়েছে। সত্যিই যদি বিশ্বকবি বিশেষণে কাউকে বিশেষিত করতেই হয় তবে সে সম্মানের অধিকারী নিঃসন্দেহে কবি আল্লামা ইকবাল। কবি নিজেও ছিলেন বহু ভাষাবিদ পণ্ডিত। তিনি উর্দু, ফারসী, ইংরেজি প্রভৃতি ভাষায় লেখনি চালিয়েছেন।


কবি The Development of Metaphisics in Persia বা প্রজ্ঞান চর্চায় ইরান’ এই বিষয়ের ওপর ডক্টরেট ডিগ্রি লাভ করেন। ১৯০৮ সালে লণ্ডন থেকে এ থিসিস প্রকাশিত হয়। এতােক্ষণ তাঁকে কবি হিসেবে পরিচয় করালাম। আসলে তিনি শুধু কবিই ছিলেন না। তিনি সমাজসেবী, রাজনীতিবিদ, প্রখ্যাত দার্শনিক আইনজ্ঞ প্রভৃতি গুণে গুণান্বিত ছিলেন। ১৯২৬ সালে তিনি পাঞ্জাব আইন পরিষদের সদস্য নির্বাচিত হন।১৯৩০ সালে নির্বাচিত হন মুসলিম লীগের সভাপতি হিসেবে।


১৯৩১ ও ১৯৩২ সালে তিনি বিলেত গমন করেন ‘গােল টেবিলে’ যােগদানের জন্য। এই বৈঠকে তিনি ভারতীয় মুসলমানদের জন্য বিভিন্ন দাবি দাওয়া পেশ করেন। অবশ্য এর আগে মুসলিম লীগের এলাহাবাদ অধিবেশনে ১৯৩০ সালের ২৯ ডিসেম্বর সভাপতির ভাষণ দিতে গিয়ে তিনি বলেন, 'আমি চাই যে, পাঞ্জাব, উত্তর-পশ্চিম সীমান্ত প্রদেশ, সিন্ধু ও বেলুচিস্তান একটি রাষ্ট্রে পরিণত হউক। পৃথিবীর এই অংশে বৃটিশ সাম্রাজ্যের ভিতরে হউক বা বাহিরে হউক-অন্ততপক্ষে উত্তর-পশ্চিম অঞ্চলে একটি মুসলিম রাষ্ট্র সংগঠনই আমার মতে মুসলমানদের শেষ নিয়তি।' এই মত অনুযায়ীই পরবর্তীকালে পাকিস্তান রাষ্ট্র জন্মলাভ করে। এ জন্য তাকে পাকিস্তানের স্বপ্নদ্রষ্টা ও রূপকার বলা হয়। অবশ্য তিনি ১৯৩৭ সালের ২১ জুন পাকিস্তানের প্রতিষ্ঠাতা কায়েদে আজম মুহাম্মদ আলী জিন্নাহকে এক চিঠিতে লিখেছিলেন, 'আমি যেভাবে প্রস্তাব করেছি সেভাবে পুনর্গঠিত মুসলিম সংখ্যাগুরু প্রদেশসমূহের একটি পৃথক যুক্তরাষ্ট্রই হল একমাত্র উপায়, যদ্বারা একটি শান্তিপূর্ণ ভারত গড়ে উঠতে পারে এবং সাথে সাথে অমুসলিম আধিপত্য হতে মুসলিম সম্প্রদায়কে রক্ষা করা যেতে পারে।



উত্তর-পশ্চিম ভারত এবং বাংলার মুসলমানদেরকে কেন একটি স্বতন্ত্র জাতিরূপে স্বীকৃতি দেয়া হবে না- যাতে তারা ভারতের এবং ভারতের।বাইরের অন্যান্য জাতিসমূহের ন্যায় আত্মনিয়ন্ত্রণাধিকার পেতে পারে?' এ উদ্ধৃতিতে তিনি যে বাংলাদেশের মুসলমানদের জন্যও একটি স্বাধীন সার্বভৌম রাষ্ট্রের স্বীকৃতি দেয়ার কথা বলেছিলেন তা নিশ্চয় বুঝা যায়। মূলত আজকের স্বাধীন বাংলাদেশের অস্তিত্বও তারই চিন্তার ফসল। অথচ এ মহান ব্যক্তিত্বকে ১৯৭১ সালের স্বাধীনতার পর থেকে অস্বীকার করার চেষ্টা করা হচ্ছে, একথা আগেই বলেছি। তাকে অস্বীকার করা হচ্ছে যে কারণে তিনি নাকি পাকিস্তানপন্থী ছিলেন। অথচ তিনি পাকিস্তান স্বাধীন হওয়ারও বেশ আগে ১৯৩৮ সালে ২১ এপ্রিল ইন্তেকাল করেন। আশা করি বুঝতে মােটেই কষ্ট হচ্ছে না যে, আমরা এ মহান ব্যক্তিত্বকে অস্বীকার করে কি পরিমাণ মূখতায় ও ক্ষতির মধ্যে নিমজ্জিত। সত্যি কথা আমাদের দেশের তথাকথিত কিছু অনুদার বুদ্ধিজীবী এর জন্য দায়ী। উপমহাদেশের এই প্রখ্যাত দার্শনিক কবি অসম্ভব দেশপ্রেমিক একজন মানুষ।ছিলেন। লেখার শুরুতেই যে কবিতাটির উদ্ধৃতি দিয়েছি তার কাব্যানুবাদ রকমের‘আরব আমার, ভারত আমার, চীনও আমার- নহে তাে পর-
মুসলিম আমি, -জাহান জুড়িয়া
ছড়ানাে রয়েছে আমার ঘর।



দুঃখের বিষয় বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার পর সচেতনভাবে এ কবিকে বর্জন করা হয়। তার প্রমাণ-ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়-এর-ইকবাল হলের নাম পরিবর্তন করে জহুরুল হক হল নামকরণ করা, পাঠ্য তালিকা থেকে তাঁর রচনা ও জীবনী বাদ দেয়া।

আমরা আশা করবাে এখন থেকে নতুন করে আবার আমরা ইকবাল চর্চায় ফিরে যাব। কবিকে তাঁর প্রকৃত সম্মানে সম্মানিত করবাে। দেশের সব শ্রেণীর পাঠ্য পুস্তকে তার রচনা অন্তর্ভুক্ত হওয়া এ জাতির কল্যাণের জন্যই অবশ্য প্রয়ােজন, সে দিকটা দেখার জন্য সরকারের প্রতি আহ্বান রইলাে। 
Next Post Previous Post