হযরত ইদ্রিস নবীর কাহিনী | হযরত ইদ্রিস নবীর জীবনী | হযরত ইদ্রিস আঃ এর জীবনী

হযরত ইদ্রিস নবীর কাহিনী | হযরত ইদ্রিস নবীর জীবনী | হযরত ইদ্রিস আঃ এর জীবনী | Hazrat Idris Nobir Jiboni

হযরত ইদ্রিস নবীর কাহিনী | হযরত ইদ্রিস নবীর জীবনী | হযরত ইদ্রিস আঃ এর জীবনী | Hazrat Idris Nobir Jiboni

হযরত ইদ্রিস নবীর কাহিনী | হযরত ইদ্রিস নবীর জীবনী | হযরত ইদ্রিস আঃ এর জীবনী 


পরিচিতিঃ
হযরত ইদ্রিস আর নাম ও বংশ নিয়ে ঐতিহাসিকগণের মধ্যে মতবিরােধ রয়েছে। তিনি হযরত নূহ আ, পরদাদা ছিলেন। এক বর্ণনা মতে তার নাম হল আখৰ। বংশনামা হল- আখনূখ ইবনে ইয়ারদ ইবনে মাহলায়েল ইবনে কাইনান ইবনে আনুশ ইবনে শীষ ইবনে আদম আ.।


উপাধিঃ ইদ্রিস হল তার উপাধি। আরবী “দবস' শব্দ থেকে উৎকলিত হয়েছে। অর্থ পাঠক বা অধ্যয়নকারী। যেহেতু তিনি নিজেও খুব বেশী অধ্যয়ন করতেন এবং দেশের জনসাধারণকে শিক্ষা-দীক্ষায় উপযুক্ত রূপে গড়ে।তুলেছিলেন। অধিকাংশ সময় তিনি মানুষকে শিক্ষা দিতেন, ওয়ায-নসিহত করতেন এবং ইবাদত-বন্দেগীতে লিপ্ত থাকতেন।


দৈহিক আকৃতিঃ তিনি গন্দম রঙের, দীর্ঘ ও সুটাম দেহের অধিকারী, সুন্দর ও সুশ্রী ছিলেন। মাথায় চুল ছিল কম তবে মুখে দাড়ি ছিল ঘন ॥ রং, রূপ ও।চেহারায় মাধুর্যতা ছিল আকর্ষণীয়। সুদৃঢ় বাহু, হাল্কা-পাতলা এবং উজ্জল্য নয়ন বিশিষ্ট ছিলেন। কথা-বার্তায় গাম্ভীর্য, নিরবতা প্রিয়, চলার সময় নিম্নদৃষ্টি, অত্যন্ত চিন্তাশীল ছিলেন। রাগান্বিত হলে শাহাদতী আঙ্গুল দ্বারা বারবার ইশারা করার অভ্যস্ত ছিলেন। তাঁর আংটিতে লিখা ছিল-  আল্লাহর প্রতি ঈমানের সাথে ধৈর্য ধারণ করলে সফলতা অর্জিত হয়।


নবুয়ত লাভঃ হযরত ইদ্রিস আ, এমনিই প্রথম থেকে অত্যন্ত ইবাদত গুজার লোক ছিলেন। সর্বদা নির্জনে থেকে ইবাদতে লিপ্ত থাকতেন। প্রাপ্ত বয়স্ক হওয়ার। পুৰু আল্লাহ।তায়ালা তাকে নবুয়তের মর্যাদায় আসীন করেন। আল্লাহু তায়ালা তাঁর প্রতি তিরিশখানা সহীফা তথা আসমানী ঐশীগ্রন্থ নাযিল করেছেন। তৎকালে বাহাত্তৰ ভাষা প্রচলন ছিল। আল্লাহ তায়ালা তাকে সব ভাষাজ্ঞান দান।করেছিলেন। যে যেই ভাষার লােক, তিনি তাকে সেই ভাষায় দাওয়াত দিতেন। ওয়ায-নসিহত করতেন।


তার বৈশিষ্ট্য: ইমাম বগভীর, লিখেছেন, হযরত ইদ্রিস আই সর্বপ্রথম।।কলম দ্বারা লেখার প্রচলন করেন। তিনিই সর্বপ্রথম সেলাই করা কাপড়।।পরিধানের প্রথা আবিষ্কার করেন। এর পূর্বে মানুষ চামড়ার পােশাক পরিধান।করত। তিনিই প্রথম আবিষ্কার করেছিলেন যুদ্ধাস্ত্র। তিনিই সর্বপ্রথম অস্ত্র দিয়ে।শক্রর বিরােদ্ধে যুদ্ধ ও সংগ্রাম।করেছিলেন। জ্যোর্তিবিদ্যা ও অংক শাস্ত্রেরও প্রথম আবিষ্কারক তিনি ১৮৬। বর্ণিত আছে যে, তিনি নিজের জামা-কাপড় নিজেই সেলাই করে ব্যবহার করতেন এবং অন্যকে জামা-কাপড় সেলাই করে দিতেন। অবশ্য সেজন্য তিনি।কোন পারিশ্রমিক নিতেন না। তিনি এতই ইবাদতকারী ছিলেন যে, একদিকে তিনি কাজ করতেন, অন্য।দিকে মনে মনে আল্লাহর যিকির করতেন। জামা-কাপড় সেলাই করার সময়।সূচের প্রতিটি ফেঁড়ে ফেঁড়ে তিনি আল্লাহর নামের তাসবীহ পাঠ করতেন।


তার আবিষ্কৃত বস্তু সমূহ: ১. দাড়ি পাল্লা, ২. জিহাদের জন্য যুদ্ধাস্ত্র, ৩. আল্লাহর রাস্তায় জিহাদ করা, ৪, গণিত এবং নক্ষত্র বিদ্যার উপর গবেষণা, ৫. কলম দ্বারা লিখন, ৬. কাপড় সেলাই বিদ্যা, ৭, কাবিল গােত্রকে বন্দী করা, ৮, সর্বপ্রথম তিনিই সূতার কাপড় পরিধান করেছেন। হযত ইদ্রিস আ, সম্পর্কে পবিত্র কুরআনে বর্ণিত হয়েছে- হে প্রিয় হাবীব! এই কিতাবে ইদ্রিসের কথা আলােচনা করুন, তিনি ছিলেন সত্যবাদী নৰী। আমি তাকে উঙ্গে উন্নীত করেছিলাম। ইঞ্জিল কিতাবের বর্ণনা মতে পৃথিবীতে তাঁর বয়স হয়েছিল ৩৫৬ বছর।

হযরত ইদ্রিস আ’র আকাশারােহণের ঘটনা: হ্যরত কা'ব আহৰার প্রমুখ বর্ণনা করেছেন, একদিন হযরত ইদ্রিস আ, প্রখর রােদের মধ্যে সারাদিন পথ চললেন। শেষে ক্লান্ত হয়ে বললেন, হে আমার প্রভুপ্রতিপালক। একদিন পথ চলতেই আমি এতাে ক্লান্ত হয়ে পড়লাম, কিন্তু যে দিন সকলে পাঁচশত বছরের পথ অতিক্রম করতে বাধ্য হবে, সেদিন তাদের কী দূরবস্থাই না হবে। তাই তােমার সকাশে আমার প্রার্থনা- তুমি সূর্যের উত্তাপকে কিছুটা স্তিমিত করে দাও। পরদিন সকালে সূর্য পরিচালনাকারী ফেরেশতা অনুভব করলাে সূর্যের উত্তাপ অনেকটা স্তিমিত। সে আল্লাহু সকাশে জিজ্ঞেস করলাে, হে আমাদের প্রভুপালনকর্তা! সূর্যের উত্তাপ স্তিমিত হওয়ার কারণ কী। আল্লাহ বললেন, আমি।এরকম করেছি আমার প্রিয়বান্দা ইদ্রিসের প্রার্থনার কারণে । ফেরেশতা বললাে, হে পরােয়ারদিগার! তুমি তাকে আমার বন্ধু করে দাও ।


আল্লাহ্ বন্ধুত্বের অনুমতি দিলেন। ফেরেশতা উপস্থিত হলাে হযরত ইদ্রিসের নিকটে। হযরত ইদ্রিস তার পরিচয় পেয়ে বললেন, আমি জানি আপনি মহাসম্মানিত এক ফেরেশতা। মৃত্যুর ফেরেশতা আযরাঈলও আপনাকে সমীহ করেন। তাই আমি বলি, আপনি তার নিকট আমার জন্য এইমর্মে সুপারিশ করুন যেনাে তিনি আমার মৃত্যুর সময়।কিছুটা পিছিয়ে দেন। আর বর্ধিত আয়ু পেয়ে আমি যেনাে আল্লাহর প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করতে পারি এবং করতে পারি আরাে অধিক ইবাদত। ফেরেশতা বললাে, মৃত্যুর সময়তাে সুনির্ধারিত। তবুও আমি মৃত্যুর ফেরেশতার নিকট আপনার আবেদনটি উত্থাপন করবাে। এরপরে সূর্যের ফেরেশতা হযরত ইদ্রিসকে আকাশে উঠিয়ে নিয়ে গেলাে। সূর্যের কাছাকাছি একস্থানে তাকে দাঁড়।করিয়ে রেখে সে উপস্থিত হলাে মৃত্যুর ফেরেশতার কাছে। বললাে, আদম সন্ত।নিদের মধ্যে একজন বন্ধু রয়েছেন আমার। তিনি আমাকে তার মৃত্যুর সময় কিছুটা পিছিয়ে দেয়ার ব্যাপারে আপনার কাছে সুপারিশ করতে বলেছেন।

মৃত্যুর ফেরেশতা বললাে, এরকম করার ক্ষমতা আমার নেই। তবে আমি কেবল তাঁর।মৃত্যুলগ্নের কথা পূর্বাহ্নে জানিয়ে দিতে পারি। এতে করে তিনি মৃত্যুর জন্য যথাপ্রস্তুতি গ্রহণ করতে পারবেন। একথা বলে মৃত্যুর ফেরেশতা তার দপ্তর খুলে।বসলাে। তারপর বললাে, আপনি এমন এক লােকের কথা বলছেন, যার মৃত্যুর কোনাে তারিখ আমার দপ্তরে নেই। তার মৃত্যু পৃথিবীতে হবে না। হবে আকাশে। সুতরাং আপনি গিয়ে দেখুন, তিনি আর জীবিত নেই। সূর্যের ফেরেশতা তখন হযরত ইদ্রিসের নিকটে গিয়ে দেখলাে, সত্যিই তিনি মৃত। হাব ইবনে মুনাবাহ বলেছেন, আকাশে হযরত ইদ্রিস জীবিত অবস্থায় রয়েছেন না মৃত অবস্থায় সে সম্পর্কে আলেমগণ বিভিন্নরকম মন্তব্য করেছেন।


একদল বলেছেন, তিনি আকাশে জীবিত অবস্থায় দায়েছেন। তার মতো মৃত্যুহীন। জীবনপ্রাপ্ত ব্যক্তিত্ব হচ্ছেন চারজন। তন্মধ্যে দুউন পয়েছেন অকিাশে । অবশিষ্ট দু’জন রয়েছেন পৃথিবীতে। আকাশের অমর নবীয়ের নাম হযরত হয়ে হযরত ইলিয়াস আ,। ওয়াহাব আদো বলেছেন, হযরত ইদ্রিস আ. ছিলেন। ও হযরত ঈসা আ.। আর পৃথিবীর অমর নবীযুগল হচ্ছেন হযরত খিজির অত্যধিক ইবাদত ওজার। তখনকার বিশ্বাসীগণৰয় সম্মিলিত ইবাদতের সমান। ইবাদত করতেন তিনি একাই। ফেরেশতারা একথা শুনে আশ্চর্যান্বিত হলাে। কৌতূহলী হয়ে আল্লাহর অনুমতি সাপেক্ষে মৃত্যুর ফেরেশতা হযরত ইদ্রিসের সঙ্গে সাক্ষাত করলাে।


হযরত ইদ্রিস আ. নিয়মিত রােযা রাখতেন। তাই ইফতারের সময় তিনি মানবরূপী ফেরেশতা মেহমানকে যথারীতি ইফতার করতে বললেন। কিন্তু মেহমান তাঁর আহ্বানে সাড়া দিলাে না। পরপর তিনদিন এরকম ঘটলাে। শেষে হযরত ইদ্রিস আ, জিজ্ঞেস করলেন, হে প্রিয় অতিথি। আপনার পরিচয় দিন। সে বললাে, আমি মৃত্যুর ফেরেশতা। আল্লাহর পক্ষ থেকে আমি আপনার সঙ্গলাভের জন্য অনুমতিপ্রাপ্ত। হযরত ইদ্রিস আ. বললেন, তবে আমার একটি কাজ করে দিন। অতিথি বললাে, কি কাজ? হযরত ইদ্রিস আ, বললেন, আমার প্রাণ হরণ করুন। আল্লাহর হুকুমে মৃত্যুর ফেরেশতা তার জান কবজ করলো। কিন্তু কিছুক্ষণ পর আল্লাহর হুকুমে তিনি আবার জীবিত হয়ে উঠলেন।



অতিথি বললাে, এরকম ঘটলাে কেনাে? হযরত ইদ্রিস আ, বললেন, আমি মৃত্যুর আস্বাদ পেতে চেয়েছিলাম। মৃত্যুবরণ করা আমার উদ্দেশ্য ছিলাে। আল্লাহ্ আমার ইচ্ছা পূর্ণ করেছেন। এখন আমি যথাসময়ে মৃত্যুবরণ করার যথাপ্রস্তুতি গ্রহণ করতে পারবাে। কারণ মৃত্যুর স্মৃতি আমার স্মরণপটে থাকবে। সদা জাগরূক। এখন আপনি আরাে একটি কাজ করে দিন আমার। আমাকে
নিয়ে চলুন আকাশে। দেখিয়ে দিন বেহেশত ও দোযখ। মৃত্যুর ফেরেশতা এবারও অনুমতি পেলাে। হযরত ইদ্রিস আ,'কে নিয়ে প্রথমে গেলাে দোযখের দ্বারপ্রান্তে। হযরত ইদ্রিস আ, বললেন, দোযখের প্রধান প্রহরীকে বলে দরজ খােলার ব্যবস্থা করুন। তাই করা হলাে।


হযরত ইদ্রিস আ, ভালাে করে দেখে নিলেন দোযখের অভ্যন্তর ভাগ। তারপর বললেন, দোযখ তাে দেখা হলো। এবার আমাকে নিয়ে চলুন বেহেশতে। মৃত্যুর ফেরেশতা তাকে নিয়ে উপস্থিত হলে বেহেশতে। আল্লাহর নির্দেশে ও তার অনুরােধে বেহেশতের দরজা খুলে। দেয়া হলাে। হযরত ইদ্রিস আ. ঘুরে ঘুরে দেখতে লাগলেন, বেহেশতের অপরূপ রূপ। মৃত্যুর ফেরেশতা বললাে, এবার ফিরে চলুন। হযরত ইদ্রিস আ.- বৃক্ষের ঢাল আঁকড়ে ধরে বললেন, আমি এখান থেকে কোথাও যাবাে না। অন্নাহর নির্দেশে তখন সেখানে উপস্থিত হলাে আর একজন ফেরেশতা।


বললাে, আপনি ফিরে যেতে রাজি হচ্ছেন না কেনাে? হযরত ইদ্রিস আ. বললেন, আল্লাহ বলেছেন, সকলকেই মৃত্যুর আস্বাদ গ্রহণ করতে হবে। আমি তা আস্বাদন করেছি। আল্লাহ্ আরাে বলেছেন, সকলকেই দেখানাে হবে দেয়। তা-ও অবলােকন করেছি আমি। একথাও তিনি বলেছেন, বেহেশতে প্রবেশকারীরা আর কখনাে বহিষ্কৃত হবে না। আমি তাে সেই জান্নাতেই প্রবেশ
করেছি। সুতরাং আমি এখান থেকে বের হবে কেননা? আল্লাহ তখন মৃত্যুর ফেরেশতাকে জানালেন, আমার অনুমতিক্রমেই তাে সে বেহেশতে প্রবেশ করেছে। সেখান থেকে বের হতে হলে আমার অনুমতিক্রমেই তা হবে। তােমাদের পক্ষ থেকে এ ব্যাপারে আর কোনাে চেষ্টা করাে না। এভাবেই হযরত ইদ্রিস আ, লাভ করেছেন এক ব্যতিক্রমী উচ্চ মর্যাদা।
Next Post Previous Post