তাযকিয়া ও তাসাউফের পরিচয় | তরিকত বা মারেফতের পরিচয় | তাযকিয়া ও তাসাউফের গুরুত্ব ও প্রয়োজনীয়তা | তরিকা ও মারেফতের বিরোধিতার পরিনাম | কুরআন হাদিসের আলোকে

   তরিকা ও মারেফাতের পরিচয়

তরিকা (الطریق) শব্দের অর্থ হলো: পন্থা, উপায়, রীতি, পথ। ইলমে তাসাউফের পরিভাষায়, আধ্যাত্মিকতার ধাপসমূহ অতিক্রম করে উন্নতির সোপানে ধাবমান পথিকদের বিশেষ কর্মধারাকে তরিকা বলে। (কাওয়াইদুল ফিকহ,৩৬২)

মারেফাত (المعرفةُ) শব্দের অর্থ হলোঃ পরিচয় ও শিক্ষা। পরিভাষায়, মারেফাত বলতে বোঝায় যে, বিষয় বা বস্তু যেভাবে আছে ঠিক সেভাবে আয়ত্তে আনা। (মানাজিলুস সায়েরিন,১১২)

তাযকিয়া ও তাসাউফের পরিচয় | তরিকত বা মারেফতের পরিচয় | তাযকিয়া ও তাসাউফের গুরুত্ব ও প্রয়োজনীয়তা | তরিকা ও মারেফতের বিরোধিতার পরিনাম | কুরআন হাদিসের আলোকে

 
তরিকা ও মারেফতের জ্ঞান অর্জনের গুরুত্ব

তরিকত, মারেফাত, হাকিকত, তাজকিয়া, ইরফান, ইহসান এ সকল জ্ঞানের সম্বিত বিষয়কে ইলমুল এরফান বা ইলমে তাসাউফ বা আধ্যাত্মিক জ্ঞান বলা হয়। শরীয়াতের এলেম শিক্ষা করা যেভাবে ফরজে আইন। অনুরূপ যে পরিমাণ তাসাউফ শিক্ষার ফলে মানুষের চরিত্র বিশুদ্ধ ও মার্জিত হতে পারে ততটুকু তাসাউফ শিক্ষা করা ফরজে আইন। তরিকত ও মারেফাতের জ্ঞান সূচনা হয় আল্লাহ ও আল্লাহর রাসূলকে পাওয়ার চেতনা মনে জাগরুক করার মাধ্যমে। আর চূড়ান্ত পর্যায়ে পৌঁছে-

انقراض تعبد اللہ کأنک تراہ فان لم تکن تراہ فانہ یراک 

অর্থঃ আল্লাহর এবাদত এমনভাবে করো যেন তাঁকে দেখছ। আর যদি দেখতে না পাও তবে ( অবশ্যই এ বিশ্বাস রাখবে) যে, তিনি তোমাকে দেখছেন। (সহিহ বুখারী)

ইমাম বুখারী রহঃ বলেন,

ان المعرفةُ فعل القلب

অর্থঃ মারেফাত হল কলবের কাজ। (সহিহ বুখারী, কিতাবুল ঈমান)

যে কর্মের দ্বারা গুনাহমুক্ত হয়ে আল্লাহর যিকির-ফিকর ও আমলের মাধ্যমে আল্লাহ তা'আলা মানুষের বন্ধুতে পরিণত হয়। তাই মারেফাত যেহেতু এই কাজটি সম্পূর্ণ বাস্তব প্রশিক্ষণ নির্ভর কাজ। তাই একজন যোগ্য প্রশিক্ষকের মাধ্যমে নিজের প্রচেষ্টায় এলেম অর্জন করতে হয়।

ব্যক্তি ও সমাজ জীবনে তাযকিয়া ও তাসাউফের প্রয়োজনীয়তা

ইলমুত তাসকিয়া তথা তাসাউফ ও তরিকত, হাকিকত ও মারফত, এসব ইলমুল ইহসানের অন্তর্ভুক্ত। যার সূচনা হলো এখলাস এর সাথে আমল কে সুন্দর করা। আর শেষ গন্তব্য হল আল্লাহকে যেন দেখে দেখে ইবাদত করা। যদি দেখার ক্ষমতা না হয়। তিনি আমাকে দেখছেন একিনের এ মাকামে পৌছা। তাছাউফ এমন সব সুন্দর চরিত্রের নাম যেগুলো সুন্দর সময় ভালো মানুষ থেকে নেক সম্প্রদায়ের মাঝে প্রকাশ পায়।

তাজকিয়া ও তাসাউফ বলতে এমন ইলমকে বুঝায়, যার মাধ্যমে আত্মশুদ্ধির অবস্থা, চারিত্রিক নিষ্কলুষতা, জাহের ও বাতেন বাহ্যিক ও অভ্যন্তরীণ দিকগুলো গঠনের মাধ্যমে চিরস্থায়ী সুভাগ্য লাভ করা যায়। যার মাধ্যমে আত্মশুদ্ধি, আল্লাহর মারফত অর্জন করা যায় ও আধ্যাত্মিক শক্তিতে রবকে পাওয়া যায়। ইলমে তাসাউফের প্রতি গুরুত্বারোপ করে ইমাম মালিক রহমতুল্লাহে আলাইহি বলেন, যে ব্যক্তি তাসাউফ বা আধ্যাত্মিক এলেম অর্জন করল কিন্তু ইলমে ফিকাহ অর্জন করল না সে যিন্দিক। আর যে ইলমে ফিকাহ অর্জন করলো কিন্তু ইলমে তাসাউফ অর্জন করতে পারলো না সে ফাসেক বা সত্যভ্রষ্ট। আর যে ব্যক্তি উভয় এলেম অর্জন করল সে গ্রহণযোগ্য বা মুহাক্কিক  আলেম হল।

আর তাসকিয়া মানে পবিত্র করা। তাজকিয়া দ্বারা উদ্দেশ্য হলো, নফস বা প্রভৃতিকে ব্যাধি ও আবিলতা থেকে পবিত্র করা। বান্দার মধ্যে সুন্দর গুণাবলী সৃষ্টি ও সমাজ থেকে আচরণগুলো দূর করার ক্ষেত্রে তাসাওফ ও তাযকিয়া যেরুপ কার্যকর ভূমিকা পালন করে অন্য কিছু এরুপ ভূমিকা রাখে না। জনগোষ্ঠী নিয়ে সমাজ তৈরি হয়। সুতরাং সমাজের প্রতিটি মানুষ যখন নিষ্কলুষ হবে তখন পুরো সমাজ অপরিহার্যভাবে সুন্দর হবে। মানুষ তার বাহ্যিক ও আত্মিক পবিত্রতার মাধ্যমে স্রষ্টা ও সৃষ্টির নৈকট্য লাভ করতে সক্ষম হয়। সে কারণে মহান আল্লাহ তায়ালা বলেন, ওই ব্যক্তি সফলকাম হয়েছে যে, তার নফসকে পবিত্র করেছে এবং ওই ব্যক্তি ধ্বংস হয়েছে যে তার নফসকে অপবিত্র করেছে। (সূরা শামস, ৯-১০)

আত্মিক এই পবিত্রতা যদি কারো মধ্যে না থাকে তবে সে হয় চতুষ্পদ জন্তুর মত, বরং তার থেকে আরও নিকৃষ্ট। এরকম লোকদের হাত থেকে সমাজ নিরাপদ থাকে না। ইলমুল তাজকিয়া অর্জন করা প্রত্যেক মুসলমানের উপর ফরজে আইন। আল্লাহ তাআলা এ প্রসঙ্গে বলেন, অনুরূপভাবে তোমাদের মধ্যে হতে তোমাদের কাছে রসূল প্রেরণ করেছি, যিনি আমার নিদর্শনাবলী তোমাদের নিকট উপস্থাপন করেন, তোমাদের পূত-পবিত্র করেন এবং তোমাদেরকে কিতাব ও হিকমত শিক্ষা দেন আর এমন বিষয় তোমাদেরকে জ্ঞাত করান যা তোমরা জানো না।  (সূরা বাকারা, ১৫১)  আল্লামা ইমাম গাজ্জালী রহমতুল্লাহি আলাইহি বলেন, অনুরূপভাবে তাওয়াক্কুল, ভয় এবং রিদা ইত্যাদি কলবের অবস্থান সমূহের জ্ঞান শিক্ষা করা ফরজ।

তাসাউফের ইলম অর্জনের বিরোধিতার পরিনাম

তাসাউফের এলেম অর্জন করার শরীয়তের এলেম এর মতই অপরিহার্য। যারা এলেম অর্জনের বিরোধিতা করে তারা ইসলামের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশকে ইসলাম থেকে খারিজ করে দিতে চায়। দ্বীনের মূল স্তম্ভ ঈমান, ইসলাম, ও ইহসান। ঈমান-আকিদা বিশ্বাস দীনপর প্রথম রোকন। ইসলাম বা ফিকাহ আমলী জীবন, আর ইহসান, তাযকিয়া, মারেফাত, হাকিকত সব মিলিয়ে ইলমে তাসাউফ। যা অস্বীকার করলে দীনের তিন ভাগের একভাগ অস্বীকার করা হয়। আল্লাহ তাআলা এরশাদ করেন, সেই ব্যক্তির অনুসরণ করবে না, যার অন্তর আমার জিকির থেকে গাফেল এবং যে আপন খেয়াল-খুশীর অনুসারী। (সূরা কাহাফ,২৮)

Next Post Previous Post