ওলি/পীরের পরিচয় | অলির বৈশিষ্ট্য | অলি/পীরের সোহবতে থাকার উপকারিতা | ওলীর মর্যাদা | পীরের মাজার যিয়ারত | ইসলামের আলো

অলির পরিচয়ঃ অলি অর্থ বন্ধু, প্রকৃত বন্ধু, সাহায্যকারী, পৃষ্ঠপোষক। বহুবচনে আউলিয়া। আর অলিউল্লাহ অর্থ হলো আল্লাহর প্রিয় বন্ধু।

পরিভাষায়, অলি বলা হয় যিনি আল্লাহ তাআলার নাম ও গুণাবলী সম্পর্কে যথাসম্ভব জ্ঞান রাখেন, আনুগত্য মূলক কাজে সর্বদা নিয়োজিত থাকেন, পাপ কাজ থেকে দূরে থাকেন এবং বিলাসিতা ও কুরুচিপূর্ণ কাজে মগ্ন হওয়া থেকে বিরত থাকেন।  (আকাইদে নাসাফী)

ওলি/পীরের পরিচয় | অলির বৈশিষ্ট্য | অলি/পীরের সোহবতে থাকার উপকারিতা | ওলীর মর্যাদা | পীরের মাজার যিয়ারত | ইসলামের আলো
পীরের বা অলির পরিচয় 

অলির বৈশিষ্ট্যঃ-  কামেল মুর্শিদ বা কামেল অলি হওয়ার জন্য কিছু শর্তাবলী রয়েছে। তা হলোঃ- 

১। কামেল মোর্শেদকে হতে হবে কামেল ঈমানদার সহি আকিদার অধিকারী এবং তাকওয়ার সর্বোচ্চ মাকাম অধিষ্ঠিত। যেমন আল্লাহ তা'আলা ইরশাদ করেন, যারা ঈমান আনে এবং তাকওয়া পরহেজগারি বজায় রাখে। (সূরা ইউনুস,আয়াত ৬৩)

২। আল্লাহর কিতাব এবং সুন্নাহের জ্ঞানে জ্ঞানী হতে হবে। তাঁর অনুসারীগণ প্রশ্ন করলে যেন জবাব পায়। আল্লাহ তাআলা এরশাদ করেন, তোমরা আহলে জিকির তথা জ্ঞানী লোকদের জিজ্ঞেস করো যদি তোমরা না জানো। ( সূরা নাহল)

আল্লাহ আরো বলেন, নিশ্চয়ই আল্লাহ কে তার আলেম বান্দারা অধিক ভয় করে।  (সূরা ফাতির)

৩। তার মাঝে থাকবে ন্যায়পরায়নতা। তাকে হতে হবে কবিরা গুনাহ হতে সম্পূর্ণ মুক্ত। সগিরা গুনাহ বারবার তার দ্বারা সংঘটিত হবে না।

৪। তাকে হতে হবে দুনিয়াবিমুখ। আখিরাতের প্রতি উন্মুখ। নেক কাজ এবং জিকিরে সদা মশগুল।

৫। সৎ কাজের আদেশ দাতা এবং অসৎ কাজ থেকে নিষেধকারী হতে হবে।

৬। ওলীগণের তথা কামেল মোর্শেদের সোহবত প্রাপ্ত হবেন। দীর্ঘ সময় পর্যন্ত তাদের সাথে আদব সহকারে অবস্থান করবেন এবং তাদের কাছ থেকে আধ্যাত্মিক নূর ও প্রশান্তি লাভ করবেন।

ইমাম গাজ্জালী রহমতুল্লাহি আলাইহি বলেন, মোরশেদ ওই ব্যক্তি যার অভ্যন্তর থেকে সম্পদ, সম্মান ও ঘরবাড়ি তৈরি লোভ দূর হয়ে যায়। তার আত্মার পরিচর্যা হবে আরেকজন কামেল মোর্শেদের হাতে এবং এভাবে চলতে চলতে ধারাবাহিকতা রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম পর্যন্ত পৌছবে। কঠোর সাধনার স্বাদ উপভোগ করবে। যেমনঃ আহার, নিদ্রা ও কথা স্বল্পতা, নামাজ, রোজা ও দানে অগ্রগামী থাকবে। রাসূলে কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর আলোর ভান্ডার থেকে নূর লাভ করবে। উত্তম স্বভাব ও প্রশংসনীয় চরিত্র ভূষিত হবে। যেমন ধৈর্য, শোকর, তাওয়াক্কুল, ইয়াকিন আর্থিক স্থিরতা, দানশীলতা, স্বল্পে তুষ্টি, আমানতদারিতা, বিচক্ষণতা, বিনয়, জ্ঞান ও প্রজ্ঞা, সততা, ভদ্রতা, লজ্জাশীলতা, ধীরস্থিরতা ইত্যাদি গুণে গুণান্বিত হবেন। অসৎ গুণাবলী থেকে পবিত্র হবেন। যেমনঃ অহংকার, কৃপণতা, হিংসা, শত্রুতা, লোভ, উচ্চাশা ইত্যাদি থেকে মুক্ত থাকবেন। এরকম মুর্শিদের বা অলির অনুকরণ করা নিশ্চিত সঠিক কাজ। তার সহবত, ফয়েজ, তাওয়াজ্জুহ দ্বারা ফানা, বাকা, বাকাউল বাকা ও মুকাররাবিনের উচ্চ মাকামে মানুষকে উন্নত করবে। যেমন আল্লাহ তাআলা এরশাদ করেন, অগ্রগামীরা অগ্রগামী হয়েই মুকাররাবিনের মাকামে অধিষ্ঠিত। হযরত আবদুল্লাহ ইবনে আব্বাস রাঃ বলেন, এক সাহাবী জিজ্ঞেস করলেন, ইয়া রাসুলাল্লাহ! আল্লাহর ওলী কারা? জবাবে তিনি বললেন, যাদেরকে দেখলে আল্লাহর কথা স্মরণ হয়।

হযরত আলী রাদিয়াল্লাহু তা'আলা আনহু বলেন, আল্লাহর ওলী হলেন ঐ সমস্ত লোক, রাত্রি জাগরণের কারণে যাদের চেহারা হলুদ বর্ণ হয়ে গেছে, অধিক অশ্রু ফেলার কারণে যাদের চক্ষু দৃষ্টিহীন হয়ে গেছে, ক্ষুধা সহ্য করতে করতে যাদের পেট শুকিয়ে চিকন হয়ে গেছে, অধিক জিকির করায় লালা বা থুথু লাগার কারণে যাদের ঠোঁট শুকিয়ে গেছে। ( তাফসীরে কুরতুবী) আল্লাহর জিকিরের যাদের গা শিওরে ওঠে, চক্ষু ক্রন্দন করে, অন্তর প্রশান্ত হয় তারাই অলি। ( ইবনে কাসির,৭/৯৫)

ওলীগণের সাহচর্যে থাকার উপকারিতা

শরীয়ত, তরিকত, হাকিকত ও মারফাতের সকল স্তর অতিক্রম করে আমল-আখলাক, নম্রতা, ভদ্রতা, দানশীলতা ইবাদত-বন্দেগিতে যিনি পরীক্ষিত, যাকে দেখলে আল্লাহর কথা স্মরণ হয় আকিদা ও আমলে যিনি সত্যের প্রতিবিম্ব তার সাথে হওয়ার জন্য আল্লাহ তাআলা নির্দেশ দিয়েছেন। আল্লাহ তা'আলা বলেন,  হে মুমিনগণ! আল্লাহকে ভয় কর এবং সত্যবাদীদের সাথী হয়ে যাও। ( সূরা তাওবা)

ওলীগণের সোহবতে থাকলে তার পরিচর্যায় খারাপ আমল দূর হয়ে ভাল আমল করার অভ্যাস গড়ে ওঠে। রাসূল সাহ বলেন, সৎসঙ্গের উদাহরণ আতরওয়ালার   মত। তার সাথে থাকলে আতর পাওয়া না গেলেও আতরের সুগন্ধ পাওয়া যাবে। ( সুনানে আবু দাউদ)

মাওলানা রুমি রঃ বলেন, একমুহূর্ত অলির সাহচর্য একশ বছরের রিয়াহিন ইবাদতপর চেয়েও উত্তম।

তিনি আরো বলেন, সৎ লোকের সঙ্গী হলে তোমাকে সৎ মানুষের পরিণত করবে। আর অসৎ লোকের সাথী হলে তোমাকে অসৎ বানাবে। ( সৎ সঙ্গে স্বর্গবাস অসৎ সঙ্গে সর্বনাশ)

ওলীগণের মর্যাদা 

ওলীগণের মর্যাদা সম্পর্কে আল্লাহ নিজেই বলেন, ভালোভাবে জেনে নাও, আল্লাহর ওলীগনের না আছে ভবিষ্যতের ভয় এবং না আছে অতীতের কোনো দুশ্চিন্তা। ( সূরা ইউনুস)

ওলীগণের মর্যাদা সম্পর্কে হাদিসে কুদসীত আল্লাহ তা'আলা বলেন, সে যদি আমার কাছে কিছু চায় আমি তাকে অবশ্যই দিয়ে থাকি। যদি সে আশ্রয় চায় আমি তাকে আশ্রয় দিয়ে থাকি।  (সহিহ বুখারী)

অন্য হাদীসে আছে, নিশ্চয় আল্লাহর বান্দাদের মধ্যে এমন একদল রয়েছেন তারা যদি আল্লাহর নামে কসম করে আল্লাহ তা'আলা অবশ্যই তা পূরণ করেন। (মুসনাদে আহমদ)

ওলীগণের কারামত:

ওলিগনের কারামত সত্য। ইমাম তাহাবী বলেন, আমরা তাদের কারামত অলৌকিক ঘটনাবলী এবং বিশ্বস্ত লোকের মাধ্যমে পরিবেশিত তাদের বিশুদ্ধ বর্ণনাসমুহ বিশ্বাস করি। অলিদের কারামত সম্পর্কে কোরআন মাজিদে এবং হাদীস শরীফে বহু বর্ণনা পাওয়া যায়। হযরত সোলায়মান আঃ এর সাহাবী আসিফ বিন বোরখিয়া চোখের ফলকের মধ্যে  সাবার রানী বিলকিসের সিংহাসন ইয়ামিন থেকে ফিলিস্তিনে আড়াই হাজার মাইল দূরত্বে নিয়ে আসা। ওমর রাঃ এর লিখিত চিঠি পেয়ে নীলনদে পানির জোয়ার সৃষ্টি হওয়া। হযরত সাদ বিন আবি ওয়াক্কাস রাঃ এর নেতৃত্বে ষাট হাজার  ঘোড়া ইরাকের দজলা নদী পার হওয়া। খাজা মইনুদ্দিন চিশতী রহমতুল্লাহি আলাইহি কর্তৃক বিশাল দিঘি আনা সাগরের পানি একটি লোটায় স্থান করে নেওয়া। এই সব ওলীদের কারামত। এসব কে বিশ্বাস করা ঈমানের অংশ। তবে ওলী হওয়ার জন্য কারামত প্রকাশ হওয়ার শর্ত নয়। দীনের উপর অটল থাকায় হলো অলির বড় কারামত।

ওলিগনের মাজার শরীফ জিয়ারত

অলীগণ দুনিয়া ও আখেরাতে সুসংবাদ প্রাপ্ত। আল্লাহ তাআলা ইরশাদ করেন, জেনে রাখ! আল্লাহর ওলীগন ভবিষ্যতে কোনো ভয় নাই অতীতের কোনো দুশ্চিন্তা নেই। যারা ঈমান আনে এবং তাকওয়া অবলম্বন করে।  তাদের জন্য দুনিয়া ও আখেরাতে রয়েছে সুসংবাদ। আল্লাহর ঘোষণার কোন পরিবর্তন নেই। এটাই মহাসাফল্য।  (সূরা ইউনুস)

ওলিগন যেহেতু দুনিয়া ও আখেরাতে সুসংবাদপ্রাপ্ত, তাই তাদের মাজার শরীফে গিয়ে তাদের মর্যাদার উসিলা করে দোয়া করলে আল্লাহ তাআলা তার প্রিয় বন্ধুর সম্মানে দোয়া কবুল করেন। আলী ইবনে মাইমুন বলেন, আমি ইমাম শাফেয়িকে বলতে শুনেছি, আমি ইমাম আবু হানিফা রঃ এর দ্বারা বরকত হাসিল করি। আমি প্রায়ি তার কবর জিয়ারতে যাই। 

আমার কোন প্রয়োজন দেখা দিলে আমি দুই রাকাত সালাত আদায় করে আবু হানিফা রহঃ এর কবরের কাছে এসে দোয়া করি এতে দ্রুত দোয়া কবুল হয়। (তারিখে বাগদাদ, খতিব বাগদাদী)

তবে মাজারে গিয়ে কোন অলির কাছে সরাসরি কিছু চাওয়া অবৈধ। চাইতে হবে একমাত্র আল্লাহ তাআলার কাছে। ওলিকে উসিলা করে ও তার মাজার শরীফের কাছে গিয়ে দোয়া করলে আল্লাহ তায়ালা ওলির সম্মানে দোয়া কবুল করেন। আল্লাহ তাআলার রাসূল নিজেও কবর জিয়ারত করতেন।

Next Post Previous Post