যাকাতের বিধান | জাকাতের খাতসমূহ | জাকাত ফরজ হওয়ার শর্তসমূহ | সম্পদের যাকাত | ২য় পর্ব

 যে সব সম্পদের যাকাত ফরজ, যাকাতের  খাতসমূহ, যারা জাকাত পাওয়ার হক্বদার, যাকাত ফরজ হওয়ার বিধান, সম্পদের যাকাতের বিধান। নিচে আলোচনা করা হলোঃ-

যে সব সম্পদের যাকাত ফরজ

কয়েক প্রকার সম্পদের যাকাত আদায় করা ফরয। সেগুলো হলোঃ-

(১) ৭.৫ তোলা বা ৮৭.৪৫ গ্রাম স্বর্ণ অববা ৫২.৫ তোলা বা ৬১২.৫৩ গ্রাম রৌপ্য অথবা তার সমপরিমাণ সম্পদ এক বছর পর্যন্ত মালিকানায় থাকলে। উল্লেখ্য যে, সম্পদের মূল্যের ২.৫% হিসেবে যাকাত দিতে হবে।

(২) উট, গরু, ছাগল।

উট কমপক্ষে ৫টি হলে,

গরু ৪০ টি হলে,

ছাগল বা বেড়া চল্লিশটি হলে যাকাত ফরজ হয়।

(৩) উৎপাদিত ফসল। যেমনঃ গম, যব, চাল, ডাল, খেজুর, আঙ্গুর, যায়তুন ইত্যাদি কম হোক বেশি হোক যাকাত দেয়া ওয়াজিব।

যাকাতের বিধান | জাকাতের খাতসমূহ | জাকাত ফরজ হওয়ার শর্তসমূহ | সম্পদের যাকাত  | ২য় পর্ব

যাকাত ব্যয়ের খাতসমূহ

যাকাত সকলকে দেওয়া যায় না। আট শ্রেণীর লোকের যাকাত দেওয়া প্রসঙ্গে পবিত্র কোরআনে আল্লাহ তাআলা সুস্পষ্ট ভাষায় ঘোষণা দিয়েছেন। তিনি বলেন,

إِنَّمَا ٱلصَّدَقَٰتُ لِلْفُقَرَآءِ وَٱلْمَسَٰكِينِ وَٱلْعَٰمِلِينَ عَلَيْهَا وَٱلْمُؤَلَّفَةِ قُلُوبُهُمْ وَفِى ٱلرِّقَابِ وَٱلْغَٰرِمِينَ وَفِى سَبِيلِ ٱللَّهِ وَٱبْنِ ٱلسَّبِيلِ فَرِيضَةً مِّنَ ٱللَّهِ وَٱللَّهُ عَلِيمٌ حَكِيمٌ

অনুবাঃ এ সদকা (যাকাত) তো ফকির মিসকিন এর জন্য, তাদের জন্য যারা সদকার কাজের জন্য নিয়োজিত, আর তাদের জন্য যাদের মন জয় করার উদ্দেশ্যে, দাস মুক্তির জন্য, ঋণগ্রস্তদের জন্য, আল্লাহর পথে এবং মুসাফিরদের জন্যে, আল্লাহ তা'আলার পক্ষ থেকে ফরজ বিধান এবং আল্লাহ সর্বজ্ঞ প্রজ্ঞাময়। (সূরা তওবাঃ ৬০)

যাকাত গ্রহণ করতে পারবে এমন আট শ্রেণীর পরিচয়

(১) ফকিরঃ- যাদের অল্প সম্পদ আছে। যা দিয়ে তাদের প্রয়োজন বা অভাব পূরণ হয়না।

(২) মিসকিনঃ- যারা নিঃস্ব, নিজের অন্নসংস্থানও করতে পারেনা। অভাবের তাড়নায় অন্যের কাছে সাহায্য চাইতে বাধ্য হয়। কর্মক্ষম হবার সত্বেও কাজের অভাবে বেকার থাকতে বাধ্য এবং মানবেতর জীবন যাপন করে, তারাও মিসকিনদের মধ্যে গণ্য।

(৩) যাকাত ব্যবস্থাপনায় নিয়োজিত কর্মকর্তা কর্মচারীঃ-  যাকাত সংগ্রহ, বিতরণ, হিসাবরক্ষণ ইত্যাদি কাজ করার জন্য যাদের নিয়োগ দেওয়া হবে। তাদের বেতন-ভাতা যাকাত তহবিল থেকে দেওয়া যাবে।

(৪) মুয়াল্লাফাতুল কুলুবঃ- অমুসলিমদেরকে আকৃষ্ট করার জন্য। এ খাতটি বর্তমানে রহিত হয়ে গেছে।

(৫) রিকাব মুক্তিপণ ধার্যকৃত দাসঃ- ক্রীতদাস তার মালিকের সাথে নির্দিষ্ট পরিমাণ অর্থ দান এর বিনিময় মুক্তি লাভের সুযোগ সৃষ্টি করলে, যাকাত ফান্ড থেকে সে অর্থ দিয়ে দাস মুক্ত করা যাবে। অথবা যাকাতের অর্থ দিয়ে দাস ক্রয় করে তাকে মুক্ত করা যাবে।

(৬) গারিমিন বা ঋণগ্রস্তদের ঋণ পরিশোধ করাঃ- কেউ বৈধ কোন কাজে ঋণ করে সে ঋণ পরিশোধ করতে সক্ষম না হলে যাকাতের অর্থ দিয়ে তাকে ঋণ মুক্ত করা যাবে। অপ্রত্যাশিত কোনো দুর্ঘটনা বা কোনো কারণে ব্যবসা নষ্ট হয়ে নিঃস্ব হয়ে গেলে তাকে যাকাত দেওয়া যাবে।

(৭) ফি সাবিলিল্লাহঃ- আল্লাহর রাস্তায় অর্থাৎ আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য আল্লাহর পথে ব্যয় করা যাবে।

(৮) ইবনুস সাবীল বা পথিকঃ-  মুসাফির বা প্রবাসী লোক স্বদেশে সম্পদ থাকলেও প্রবাসে যদি রিক্তহস্ত হয়ে পড়ে তাহলে তাকে যাকাত দেওয়া যাবে।

যাকাত ফরজ হওয়ার শর্ত

ইসলামী শরীয়ত অনুযায়ী যাকাত ফরজ হওয়ার কয়েকটি শর্ত হলোঃ-

  • মুসলমান হওয়া।
  • প্রাপ্তবয়স্ক (বালেগ) হওয়া।
  • সুস্থ মস্তিষ্কে সম্পন্ন হওয়া।
  • নিসাব পরিমাণ সম্পদের মালিক হওয়া।
  • ঋণগ্রস্ত না হওয়া।
  • পূর্ন স্বাধীন হওয়া।
  • সম্পদ চন্দ্র মাসের হিসেবে এক বছরকাল স্থায়ী হওয়া।
  • মালিকানা পরিপূর্ণ হওয়া।

কতিপয় গুরুত্বপূর্ণ সম্পদের যাকাতের বিধান

ক. গরু-মহিষের যাকাতঃ-

৩০টি গরু মহিষের মালিক এর উপর যাকাত ফরজ। এর কম হলে যাকাত নেই।

৩০ টি গরু মহিষের জন্য গরু বা মহিষের এক বছর বয়সী একটি বাচ্চা দিতে হবে।

চল্লিশটি গরু-মহিষ হলে এমন দুই বছরের একটি বাচ্চা যাকাত দিতে হবে।

৬০ টি গরু-মহিষ হলে এক বছর বয়সের দুইটি বাচ্চা যাকাত দিতে হবে।

৬০ এরপর প্রত্যেক ৩০ টি গরু মহিষের জন্য একটি এক বছরের বাচ্চা এবং প্রত্যেক চল্লিশটি গরু-মোষের জন্য একটি ২ বছরের বাচ্চা যাকাত দিতে হবে।

খ. ভেড়া ছাগলের যাকাত

ভেড়া বা ছাগলের সংখ্যা ৪০ এর কম হলে কোন যাকাত দিতে হবে না।

ভেড়া বা ছাগলের সংখ্যা ৪০ থেকে ১২০ পর্যন্ত হলে একটি, ২০০ পর্যন্ত হলে দুইটি,  ৩০০ পর্যন্ত হলে তিনটি, ৪০০ পর্যন্ত হলে চারটি বেড়া বা ছাগল যাকাত দিতে হবে।

৪০০ এর পরের প্রতি ১০০ পূর্ণ হলে প্রতি শতক এর জন্য একটি ছাগল বা ভেড়া যাকাত দিতে হবে।

কতিপয় গুরুত্বপূর্ণ খাতে যাকাতের বিধান

(ক) অলংকারের যাকাতঃ-  স্বর্ণের যাকাত ওয়াজিব হওয়ার জন্য শর্ত হলোঃ নেসাব পরিমাণ হওয়া। সাড়ে সাত তোলা স্বর্ণ অথবা সাড়ে বায়ান্ন তোলা রুপা বা সমপরিমাণ টাকা এক বছর পর্যন্ত জমা থাকলে, তাকে যাকাত দিতে হবে। ( ফতওয়ায়ে আলমগীর, প্রথম খন্ড)

(খ) মুদ্রার যাকাতঃ- প্রচলিত মুদ্রা। যেমনঃ টাকা, ডলার, পাউন্ড, ইউরো, হাতে রক্ষিত নগদ অর্থ, ব্যাংকে রক্ষিত নগদ অর্থ, সঞ্চয় পত্র, সিকিউরিটি, শেয়ার সার্টিফিকেট, পূর্বের বকেয়া পাওনা ঋণ, চলতি বছরের দেওয়া ঋণ এ সবকে নগদ অর্থের মধ্যে ধরে চল্লিশ ভাগের এক ভাগ যাকাত দিতে হবে। যদি তা সোনা ও রূপার নেসাবের মূল্যের সমান হয়।

(গ) ব্যবসার মালের যাকাতঃ-  ব্যবসায় পণ্য যে প্রকারেই হোক যদি এর মূল্য স্বর্ণ বা রৌপ্যের এর নেসাব পরিমাণ হয় এবং এক বছর কাল স্থায়ী ও মুক্ত হয়। তাহলে পুর্ন মালের ( শতকরা ২.৫০) ৪০ ভাগের এক ভাগ যাকাত হিসেবে আদায় করতে হবে।  (হেদায়া প্রথম খন্ড)

বিভিন্ন প্রকার পণ্য হলে সবগুলো সম্বন্ধিত মূল্য নেসাব পরিমাণ হলে বছরান্তে যাকাত আদায় করতে হবে।

(ঘ) মৎস্য প্রকল্পঃ-  মাছ কিংবা মাছের পোনা ক্রয় করে পুকুরে ছাড়লে এগুলো বিক্রি করা নিয়ত থাকলে এগুলোর মূল্যের উপর যাকাত ফরজ হবে। আর সেগুলোর ডিম বা পোনা বিক্রির মাধ্যমে অর্থ উপার্জনের নিয়ত থাকলে, সে ডিম বা পোনা বিক্রি লব্ধ আয়ের উপর যাকাত ফরজ হবে। (ফাতওয়া ও মাসায়েল, ইফা-৪/৯৩)

(ঙ) ব্যাংকে গচ্ছিত টাকার যাকাতঃ-  ব্যাংকে গচ্ছিত টাকার মালিকানা যেহেতু নিজের স্বাধীন ভাবে ভোগ করা যায়। তাই গচ্ছিত আমানতের যাকাত দেওয়া ফরজ। ফিক্স ডিপোজিটের টাকার যাকাত দিতে হবে। প্রতিবছর আদায় না করে থাকলে টাকা উত্তোলনের পর প্রতি বছরের হিসাব করে যাকাত পরিশোধ করতে হবে।

Next Post Previous Post